ফের আলোচনায় যশোরের চোর সিন্ডিকেটের হুতা শাহিন কবীর

যশোর : যশোরের বহুল বিতর্কিত গাড়ী চোর সিন্ডিকেটের হুতা শাহিন কবিরের ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আরও নানা অপকর্মের তথ্য বের হতে শুরু করেছে। শাহিনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিকরা লিখিত দিয়েছে বাস মালিক সমিতির কাছে। শাহিন কবিরের বাবা কুটি মিয়া ও তার ভাই শামীম আহমেদ দুইজনই খুনি। বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) খুনের অভিযোগে শাহিনের ভাই শামীমকে গ্রেফতার করেছে নড়াইলের লোহাগড়া থানা পুলিশ। শাহিনের মতো বৈশিষ্ট্য চরিত্রের অধিকারী তার ভাই শামীমের।

এদিকে, যশোর মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির নির্বাহী কমিটিসহ সাধারণ সদস্যরাও তার বিরুদ্ধে একট্ট হয়েছে। প্রতারণা মূলকভাবে মালিক সমিতির সদস্যদের ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে শাহিনের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শাহিন কবির যশোর মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির সদস্য হওয়ার পর থেকে শ্রমিকদের সাথে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করে। মালিক সমিতিকে ব্যবহার করে চালায় নানা অপকর্ম। যার সর্বশেষ শিকার হয়েছে শহরতলী মুড়লি মোড়ে বাস মালিক সমিতির নামে কাউন্টার বসিয়ে। শুধু কাউন্টার বসিয়ে নয়, ওই স্থানে যে সব শ্রমিকরা কাউন্টার বসিয়ে দীর্ঘদিন গাড়ি পরিচালনা করতো তাদের গাড়ী জোর পূর্বক ছিনিয়ে নেয় এবং নিজ কাউন্টার দিয়ে ওই সব পরিবহন পরিচালনা করতে থাকে। এতে করে কয়েকজন শ্রমিক বেকার হবার উপক্রম হয়। ফেম পরিবহনের ম্যানেজার ফুলমিয়া মালিক সমিতির কাছে লিখিত অভিযোগে বলেন, মুড়লি মোড়ে ফেম পরিবহন চালাতে হলে টাকা দিতে হবে। মুড়লি মোড়ে মালিক সমিতির কাউন্টার ছাড়া আর কোন কাউন্টার থাকবে না বলে হুমকি দেয়। শাহিন কবির সন্ত্রাসী দিয়ে মুড়লি মোড় থেকে ছেড়ে যাওয়া দূরপাল্লার পরিবহন যাতাযাতের বাঁধা প্রদান করে। শুধু তাই নয়, ফেম পরিবহনের মালিক আনোয়ার হোসেনকে ফোন করে মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির কাউন্টারের মাধ্যমে গাড়ী চালানো জন্য হুমকিও দেয়। এরপর বিষয়টি মালিক সমিতির কানে গেলে শাহিন কবির মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির সাইন বোর্ড খুলে ফেলে। এরপর এম কে পরিবহনের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে চাঁদাবাজি চালায়।
এদিকে, এম কে পরিবহন (মা কালী পরিবহন) নামটিও ছিনতাইকৃত বলে ম্যানেজার অচিন্ত্য কুমার ম-ল জানান।

তিনি বলেন, এম কে পরিবহনের মালিক একজন হিন্দু লোক। যশোর মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রমেন ম-ল এম কে পরিবহনের মালিক। এম কে পরিবহন দুটি যশোর-রাজশাহী রুটে চলাচল করতো। সে সময় শাহিন কবির এম কে পরিবহনের কাউন্টারে উঠাবসা করতো। এতে করে এক পর্যায়ে রমেন ম-লের ছেলে সমেন ম-ল রাজুর সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। কোন এক সময় এম কে পরিবহন ছোট এবং নষ্ট হওয়ার কারণে যাত্রীদের সেবার উদ্দেশ্যে শাহিন কবিরের গাড়ীটি কিছু দিন চলাচল কথা বলে রাজু। এতে শাহিন কবির রাজি হয়ে যায়। এনিয়ে একটি চুক্তিও হয়। ওই চুক্তিতে রমেন ম-ল তার ছেলে সমেন ম-ল রাজুর কোন সই-স্বাক্ষর নেই। ম্যানেজার হিসেবে তিনি (অচিন্ত্য কুমার ম-ল) স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে শাহিন কবির ওই রুট আর ছাড়েননি। জোর পূর্বক তিনি রুটটি দখল করে রেখেছেন। এ নিয়ে শালিস মিমাংসাও হয়েছে। কিন্তু কোন ফল হয়নি।
শাহিন কবিরের বিরুদ্ধে মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির কাছে লিখিত দিয়েছেন মুড়লি মোড়ে কয়েকটি পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার শফিকুল ইসলাম।

লিখিত অভিযোগে তিনি বলেছেন, তার অধীনে থাকা পরিবহনগুলো থেকে মালিক সমিতরি নামে শাহিন কবির জোর পূর্বক চাঁদা আদায় করছেন। একই রকম অভিযোগ করেছেন জাহিদুল ইসলাম ইদরিস নামে বিআরটিসি কাউন্টার মাস্টার।

এদিকে, পূর্ববারান্দীপাড়া লিচু তলা কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শাহিন কবিরের বাবা কুটি মিয়া একজন খুনি। তার প্রতিবেশি তরকারি ব্যবসায়ী খোকনকে যশোর বড়বাজারে প্রকাশ্যে খুন করে। খোকনকে খুন করে কুটি মিয়া পূর্ববারান্দীপাড়া লিচু তলা এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন এলাকায় বসবাস শুরু করে। পরে হুশতলায় বাড়ি ভাড়া করে বসবাস শুরু করে। তার ভাইও একজন দুর্বৃত্ত। সে মানুষ খুন করতে গিয়ে নিজেই খুনের শিকার হয়।

বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) তার আর এক ভাই শামীম আহমেদ খুনের অভিযোগে নড়াইলের লোহাগড়া থানা পুলিশ গ্রেফতার করেছে। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার চড়বালিদিয়া গ্রামের সুজাত হত্যাকা-ের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়।

সুজাত হত্যা মামলার আইও এসআই রমজান জানান, গত বছর (২০১৯) ২৩ মার্চ চড়বালিদিয়া গ্রামের মাঠ থেকে সুজাতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ তদন্তে পুলিশ শামীমের সম্পর্ক পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সুজাত পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। সে যশোর সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে সরোয়ার হোসেনের বাড়িতে তার মাকে নিয়ে ভাড়া থাকতো। ভাড়া থাকার সুবাদে সরোয়ার হোসেনের সেজ মেয়ে মৌ’র সাথে সুজাতের একটি প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই প্রেম সরোয়ার হোসেনের স্ত্রী মেনে নিতে পারে নি। তিনি সুজাতের হত্যার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনায় সরোয়ার হোসেনের স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক শামীম আহমেদ সঙ্গ দেয়। তারা ভারতীয় ক্রাইম পেট্রোল আদলে সুজাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনানুযায়ী তারা একটি মাইক্রেবাস নিয়ে লোহাগড়া উপজেলার চড়বালিদিয়া গ্রামের সুজাত বাড়িতে আসে। তার বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে মাঠের মধ্যে মাইক্রোবাসে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে যায়।

লোহাগড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আলমগীর হোসেন বলেন, সুজাত হত্যাকা-ের বিষয়ে দীর্ঘ তদন্ত চলছে। দোষীদের চিহ্ণিত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে। ফলে কোন অপরাধী ছাড় পাবে না। খেঅজখবর নেওয়া হচ্ছে এ মামলার আসামিদের পরিবার সম্পর্কেও। যারা এই অপরাধীদের সহযোগিতা করবে তাদেরকেউ ছাড় দেওয়া হবে না।

যশোর অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতিকে ব্যবহার ও শাহিন কবিরের অপকর্মের প্রতিবাদ করায় রক্ষা পায়নি সংগঠনের সাবেক সভাপতি আশরাফুল আলম কুটি। তাকে হত্যার চেষ্টা চালায় শাহিন কবিরের ক্যাডাররা। রাতের আধারে হুশতলা মোড়ে কুটিকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে যায়। পরে তাকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। কুটিকে ১৬টি সেলাই দেওয়া হয়। পরে শাহিন কবিরের অত্যাচারে তিনি সংগঠন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আশরাফুল আলম কুটি বলেন, আল্লাহ বিচার করছে। ও মানুষকে জ্বালিয়েছে, এখন ও জ্বলছে। ও জ্বলে-পুড়ে ছার-খার হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, ‘আমি ২০১৪ সালে অটোমোবাইল মালিক সমিতির নির্বাচন করেছিলাম। সমিতির সদস্যদের কল্যাণে কাজ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু শাহিন কবির তা করতে দেয়নি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শাহীন কবির বলেন, আমার বিরুদ্ধে যশোর মিনিবাস-বাস মালিক সমিতি এক তরফাভাবে গঠনতন্ত্র বিরোধী কার্যকলাপ চালাচ্ছে। সমিতির সভাপতি ও সম্পাদ স্বৈরাচারীভাবে সংগঠন চালাচ্ছে। আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। আমার বিরুদ্ধে সভাপতি-সম্পাদক কলকাঠি নাড়াচ্ছে। আমি তাদের ছাড়বো না।