টাকা রফাদফা : যশোর খাদ্য গুদামে ঢুকল পুরাতন বস্তা

jessore map

যশোর : চলতি বোরো মৌসুমে যশোরের বিভিন্ন খাদ্য গুদামে সরকারী আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে পুরাতন বস্তায় ধান-চাল সংগ্রহ শুরু করেছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুর্নীতি করে আবার কেউ কেউ হাতিয়ে নিচ্ছে কাড়ি কাড়ি টাকা। অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আয়ান জুট মিলের সাথে গোপনে আতাঁত করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে যশোর জেলা খাদ্য বিভাগের যাচাই-বাছাই কমিটি নতুন বস্তার পরিবর্তে পুরাতন বস্তা অনুমোদন দিয়েছে। যার সভাপতি যশোর জেলা খাদ্য কর্মকর্তা লিয়াকত আলী, সদস্য সচিব সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফুজ্জামান এবং সদস্য প্রতিটি খাদ্য গুদাম ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। এই যাচাই-বাছাই কমিটি বস্তা দেখে অনুমোদন দেওয়ার পরেই ১ লাখ খালি বস্তা আসে যশোর সদর উপজেলা খাদ্য গুদামে। এখান থেকে খাদ্য গুদাম ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের টাকা দেওয়ার শর্তে এই পুরাতন বস্তা নেওয়ার জন্য বলা হয়, নাম প্রকাশ না করার অঙ্গীকারে জানিয়েছেন কয়েকজন খাদ্য গুদাম ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
বিশ^স্থ সূত্রে জানা যায়, গত জুনের ২৮ ও ৩০ তারিখ ২টি চালানের মাধ্যমে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আয়ান জুট মিল থেকে যশোর সদর উপজেলা খাদ্য গুদামে ধান-চাল ক্রয় করার জন্য ১ লাখ খালি বস্তা আসে। সেখান থেকে ১৮ হাজার নাভারণ খাদ্য গুদামে ও ১৮ হাজার ঝিকরগাছা খাদ্য গুদামে পাঠানো হয়, যার প্রেরক হল যশোর সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফুজ্জামান। বাকি বস্তাগুলো সদর গুদামে রাখা হয় এবং প্রত্যেক খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যথানিয়মে তা গ্রহণ করে খাতায় এন্ট্রি করে। যার প্রতিটি বস্তায় ৫০ কেজি করে ধান-চাল ক্রয় করা হবে। সরকারী খাদ্য নীতিমালা-২০১৭ অনুযায়ী ধান-চাল ক্রয় করার জন্য ঠিকাদার নতুন বস্তা সরবরাহ করবে। কিন্তু এখানে তা না করে ঠিকাদারের সাথে একটি বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে পুরাতন বস্তা সরবরাহ করা হয়। অভিযোগ উঠেছে যশোর জেলা খাদ্য কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর সহযোগিতায় এই তিন খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যোগসাজস করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়, বিনিময়ে তারা সব পুরাতন বস্তা দেয়। বস্তার গায়ে যে সীল লাগানো আছে তা অনেক পুরাতন এবং তাতে অনেক জুটমিলের নাম দেওয়া আছে, সাল ২০১২ থেকে শুরু করে বর্তমান সাল পর্যন্ত।
ঘটনাটি প্রকাশ পেলে এ বিষয়ে উপরের নির্দেশে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন খুলনা জেলা খাদ্য কর্মকর্তা তানভির রহমান, সহকারী রসায়নবিদ ইকরামুল কবীর ও টিসিএফ হাফিজুর রহমান। এই তদন্ত কমিটির সদস্যরা গত ১৪ জুলাই মঙ্গলবার খাদ্য গুদামগুলো তদন্ত করে তার তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছে ১৮ জুলাই শনিবার। তদন্ত রিপোর্টের ফলাফল আগামী কয়েকদিনের মধ্যে প্রকাশ হবে। তবে সংশ্লিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে তদন্ত রিপোর্ট পক্ষে নিতে ইতিমধ্যেই জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছে ফেঁসে যাওয়া কর্মকর্তারা।
যশোর সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফুজ্জামান মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা সঠিক না বলে অস্বীকার করে বলে, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১ লাখ খালি বস্তা এসেছে। বস্তাগুলো পুরাতন তাই এবিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত করে গেছে। বস্তাগুলো সব ফেরত নিয়ে গেছে এবং পাল্টিয়ে সব নতুন বস্তা দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, বস্তা আমাদের মাধ্যমে আসে না, প্রত্যেক গুদামের চাহিদার বিপরীতে এগুলো উপরের নির্দেশে ঠিকাদাররা সরবরাহ করে থাকে। আমরা শুধু এগুলো রিসিভ করি এবং এতে আমাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। মিটে গেছে এটা নিয়ে আর রিপোর্ট করার দরকার নাই।
নাভারণ খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান বলেন, প্রোগ্রাম করে বস্তা এসেছিল। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি এসে দেখে আলাদা করে রেখে গেছে। ওটা চেঞ্জ করে নিয়ে যাবে।
ঝিকরগাছা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রবোধ কুমার পাল বলেন, যদি সরাসরি মিল থেকে বস্তা আসে তাহলে আমাদের দেখার বিষয় থাকে। যেহেতু প্রেরক হল যশোর সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফুজ্জামান সেহেতু ওই বস্তা আমি রিসিভ করেছি। যাচাই-বাছাই কমিটিতে আমাদের নাম থাকলেও ওই সময়ে আমাদের রাখা হয় না।
যশোর জেলা খাদ্য কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, আমি গত ৯ তারিখে যোগদান করেছি। পরে জানতে পেরেছি বস্তার বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে এবং তার তদন্ত চলছে।
তদন্ত কর্মকর্তা খুলনা জেলা খাদ্য কর্মকর্তা তানভির রহমান বলেন, উপরের নির্দেশে তদন্তের ভার পেয়ে তদন্ত করে যা সত্যি পেয়েছি সেগুলো নিয়ে তদন্ত রিপোর্ট গত শনিবার আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তার দপ্তরে জমা দিয়েছি। তদন্ত রিপোর্ট খুব তাড়াতাড়ি প্রকাশ হবে এবং এবিষয়ে যারা জড়িত কর্তৃপক্ষ এদের বিরুদ্ধে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে যার যতটুকু দোষ আছে আশাকরি কর্তৃপক্ষ সেটা বিবেচনায় নেবে।