৪ দিনের মাথায় অজামিনযোগ্য মামলার আসামির জামিন

যশোর : মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি ও ১০ লাখ টাকা দাবিতে আট দিন ধরে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনায় অভিযান চালিয়ে ভিকটিমকে উদ্ধার ও জিম্মিকারীকে আটক করে র‌্যাব। এ ঘটনায় অজামিনযোগ্য একাধিক ধারায় মামলাও হয়। কিন্তু ঘটনার মাত্র চারদিনের মাথায় আসামি জামিনে মুক্ত হয়েছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ‘সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিকে জেলহাজতে আটক রাখা প্রয়োজন’ উল্লেখ করলেও রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আসামির জামিনের বিরোধিতা করেননি। এমনকি দুই পক্ষের আইনজীবিই পিপির চেম্বারে বসে ভার্চুয়াল শুনানিতে যুক্ত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় যশোরের আদালতপাড়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
র‌্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের একটি অভিযানের প্রেস বিজ্ঞপ্তি গত ১ আগস্ট গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে র‌্যাব-৬ এর সিপিসি-৩ এর যশোরের ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডারের নেতৃত্বে একটি আভিযানিক দল যশোর জেলার শার্শা থানাধীন কুঁচেমোড়া এলাকার মেসার্স খালিদ বেভারেজ প্রা. লি. ফ্যাক্টরিতে অভিযান চালায়।
অভিযানে জিম্মি করে রাখা গাইবান্ধার সাঘাটা থানার পালপানি মন্ডলপাড়া এলাকার মৃত গোলাম মোস্তফা মন্ডলের ছেলে বদিউজ্জামান মন্ডলকে (৩৩) উদ্ধার ও জিম্মিকারী যশোরের শার্শা উপজেলার বড়বাড়িয়া পানবাড়ি এলাকার কোরবান আলীর ছেলে খালিদ হাসান শান্টুকে আটক করা হয়। এ সময় আসামির শর্টগান, গুলি, স্টিলের পাইপ, প্লায়ার্স, সাদা স্ট্যাম্প, ব্লাঙ্ক চেক উদ্ধার করে র‌্যাব।
এ ঘটনায় পরদিন ১ আগস্ট শার্শা থানায় ধারা- ৩৪৩/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৩৮৪/৩৮৫/৩৮৭/৩৭৯/৫০৬/৩৪ বাংলাদেশ পেনাল কোড আইনে মামলা করেন ভিকটিম বদিউজ্জামান মন্ডলের স্ত্রী শানজিদা আক্তার বিথী।
বাদী শানজিদা আক্তার বিথী জানান, তার স্বামী বদিউজ্জামান মন্ডল মেসার্স খালিদ বেভারেজ প্রা. লি. ফ্যাক্টরিতে ম্যানেজার পদে কর্মরত। প্রতিষ্ঠানের মালিক খালিদ হাসান শান্টু গত ২৪ জুলাই থেকে তার স্বামীকে ফ্যাক্টরিতে আটকে রেখে ১০ লাখ টাকা দাবি করে নির্যাতন শুরু করেন। তাকে বেধড়ক মারপিট করে গুরুতর অসুস্থ করার পর প্লায়ার্স দিয়ে নখ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। মাথায় শর্টগান ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে সাদা স্ট্যাম্প ও ব্লাঙ্ক চেকে সই করিয়ে নেন। টাকার জন্য নির্যাতন করে তাদের কাছে ফোন করে চাপ দেওয়া হয়। টানা আটদিন এমন অত্যাচার নির্যাতনের পর তিনি (শানজিদা আক্তার বিথী) র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করলে ৩১ জুলাই র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ভিকটিমকে উদ্ধার ও আসামিকে আটক করে।
শার্শা থানায় ১ আগস্ট দায়ের করা এ মামলা তদন্তের দায়িত্ব পান উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন। তিনি আসামিকে আদালতে সোপর্দ করে উল্লেখ করেন, মামলাটি সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিকে জেলহাজতে আটক রাখা প্রয়োজন। ৩ আগস্ট শার্শার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামি খালিদ হাসান ওরফে শান্টুর জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়।
অভিযোগ উঠেছে, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামির জামিনের জন্য চাপ প্রয়োগ এবং আদালত বর্জনের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
একদিন পর ৪ আগস্ট আসামির আইনজীবী মোজাফফর উদ্দিন মোহন যশোর ভার্চুয়াল আদালতে জামিনের জন্য আবেদন করেন। শুনানি শেষে যশোর ভার্চুয়াল আদালতের বিচারক সিনিয়র দায়রা জজ মো. ইখতিয়ারুল ইসলাম মল্লিক আসামি খালিদ হাসান শান্টুর জামিন মঞ্জুর করেন। জামিন আদেশে বিচারক উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ পাবলিক প্রসিকিউটর ভার্চুয়াল শুনানিকালে আসামির জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেননি।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ্যাডভোকেট ইদ্রিস আলী বলেন, আমি রাষ্ট্রের পাবলিক প্রসিকিউটর, সরকারের না। যেটি যথার্থ সেটিই বলবো। অনেক সময় আমার কথা আসামির পক্ষে যেতেও পারে। কারণ আমি রাষ্ট্রের, আমি সবার। তবে আমি যথার্থ কথা বলেছি কিনা সেটাই বিবেচ্য।
এ্যাডভোকেট ইদ্রিস আলী স্বীকার করেন এই মামলার চাঁদাবাজির ধারাটি ননবেইলঅ্যাবল (অজামিনযোগ্য)। তবে তিনি দাবি করেন, ভিকটিম আসামির ফ্যাক্টরির ম্যানেজার। এখানে চাঁদাবাজির বিষয়টি আসে না। এটি বাদ দিলে অন্য ধারাগুলো জামিনযোগ্য। আদালত সবপক্ষের বক্তব্য শুনে জামিন দিয়েছেন। আর তার চেম্বারে বসে আসামি পক্ষের আইনজীবীর শুনানিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
এ ব্যাপারে আসামিপক্ষের আইনজীবী মোজাফফর উদ্দিন মোহনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি ‘জামিনের ব্যাপারে আদালতে খোঁজ নেন’ বলে ফোন কেটে দেন। এরপর ফোন দিলে তিনি আর ফোন ধরেননি।
এ বিষয়ে সাবেক পিপি এ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম পিটু জানান, র‌্যাব কর্তৃক ওই আসামিকে আটক ও ভিকটিম উদ্ধারের ঘটনাটি তিনি জানেন। এই মামলার ৩০৭, ৩৮৫ ও ৩৮৭ অজামিনযোগ্য ধারা। রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে মামলায় বাদী ও ভিকটিমের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দেওয়া। এরপর আদালত বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ যদি আসামির জামিনের বিরোধিতাই না করে, তা খুবই দুঃখজনক।
অভিযোগ উঠেছে, খালিদ হাসান শান্টুর জামিনে পাঁচ লাখ টাকার বাণিজ্য হয়েছে। এ নিয়ে আদালতপাড়ায় নানান গুঞ্জন চলছে। তবে এসব অভিযোগ ‘অমূলক’ বলে দাবি করেছেন পিপি এ্যাডভোকেট ইদ্রিস আলী।