বেনাপোল স্থলবন্দর ট্রাফিক পরিদর্শক এনামুল হক মোল্যার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই সরকারি নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করে চলছে বহাল তবিয়তে

এ আলী, বেনাপোল : যশোরের বেনাপোল স্থল বন্দরে ত্রাসের রাজ্য কায়েম করে চলেছে আলোচিত সমালোচিত ট্রাফিক পরিদর্শক এনামুল হক মোল্লা। প্রায় একযুগ ধরে বন্দরের ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড-৩১ নিজের দখলে রেখে নানা ধরণের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নিজে ট্রাফিক পরিদর্শক হলেও এডি আতিকুলের ঘর দখল করে বসে আছেন। এছাড়া সরকারী বদলি আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে বহাল তবিয়তে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন ইচ্ছে খুশি মত। বদলি হলে কয়েকদিন তিনি গাঁ ঢাকা দেন, পরে আবার একই স্থলে এসে একই অপকর্ম শুরু করেন। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে স্থলবন্দরের কর্মকর্তা, কর্মচারী, আমদানীকারক, রফতানীকারকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। অবিলম্বে তার অপসরণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর প্রধান কার্যলয় থেকে পরিচালক (প্রশাসন) প্রদোষ কান্তি দাস স্বাক্ষরিত এনামুল হক মোল্যার বদলি আদেশ আসে। যার স্মারক নং (১৮.১৫০.০১৯.২০.০০.০০২.২০১২)। আদেশে তাকে ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড-৩১ থেকে তাকে বেনাপোল বন্দরের ৩৯ নং গুদামে বদলি করা হয়। এ গুদামে গুদামজাতকরণ ও বিতরণ ছাড়া তেমন কোন কাজ না থাকায় তিনি কিছুতেই সেখানে যেতে রাজি হননি। বিষয়টি নিয়ে উর্দ্বতন কর্মকর্তাকে হুমকিও দেন তিনি। বদলি আদেশের পর তিনি ডিসেম্বরের শেষের দিকে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে বেনাপোলে ফিরে আসেন চলতি বছরের জানুয়ারীর শেষে। অথচ এসময়ে তিনি বেনাপোল স্থল বন্দরে অবস্থান ও কোন কাজ না করেই বেতনের সাথে ওভারটাইমের টাকা হাতিয়ে নেন। বিষয়টি নিয়ে বন্দরে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

সূত্র আরো জানায়, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড-৩১ দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের আমদানি রফতানি মালামালের প্রধান ট্রানজিট। এখান থেকে গাড়ি প্রতি এনামুলকে উৎকোচ না দিলে বিভিন্ন পণ্য খালাশ হয়না। এছাড়া তার মনমতো উৎকোচ দিলে সরকারী রাজস্বও দেয়া লাগেনা। আমদানীকৃত বিভিন্ন ফল, টমেটো, কাচাঁ ঝাল, মাছ, শুটকি মাছ, পিয়াজ, রসুন, শুকনো ঝালসহ বিভিন্ন পণ্য খালাশের জন্য সরকারী রাজস্ব প্রদানের পর ট্রাফিক পরিদর্শক এনামুলকে অতিরিক্ত টাকা না দিলে দিনের পর দিন মনগড়া অজুহাতে পণ্য আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অবাক ব্যাপার হচ্ছে বেনাপোল বন্দরে বর্তমানে সকল কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হয়। অন্য সকল ট্রাফিক পরিদর্শকের অনলাইনে নিজস্ব আইডি থাকলেও এনামুল নানা দূর্নীতির আশ্রয় নিতে আজ অব্দি পর্যন্ত নিজের নামে আইডি না খুলেই ইচ্ছে মত কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড-৩১ থাকে বহিরাগতদের অবাধ চলাচল। প্রবেশ গেট দিয়ে তার নাম করে স্থানীয় দালাল, চোরাকারবারী, মাদককারবারী আড্ডায় মেতে ওঠে। তার ইন্ধনে বহিরাগতরা প্রতি ট্রাক থেকে বকশিস হিসেবে পণ্য নামিয়ে তা বিক্রি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে এনামুলের বিরুদ্ধে। সরকারী কর্মকর্তা হয়ে বহিরাগতদের নিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠার সাথে প্রতিদিন ওই সেডে চলে বাহারী খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। আবার কোন কোন সময় অপকর্ম করে রোজগার করা টাকা দিয়ে তিনি লালিত চোরাকারবারী, দালালসহ বন্দর কর্মকর্তাদের গরু, ছাগল জবাই করে আপ্যায়নও করান। বিভিন্ন দিবস আসলে চলে অতিরিক্ত চাঁদাবাজী। বিভিন্ন সময় রাতে তার অফিসে নির্দিষ্ট কয়েকজনকে নিয়ে মদ্যপানে মেতে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েকবছর আগে ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড-৩১ এর ডিডি মামুনকে জনসন্মুখে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, শারীরিক ও মানসিক হেনস্তা করে। এছাড়া এডি আতিকুজ্জামানকে হুমকি দিয়ে তার অফিস কক্ষ দখল করে আড্ডা দেয়। নিজ ট্রান্সশিপমেন্ট কিংবা বেনাপোল বন্দর কর্মকর্তাদেরই শুধু নয় তিনি প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সাথেও অশোভন আচরণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঢাকা অফিসের পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ দেন তিনি। প্রধান কার্যালয়ের অডিট অফিসার আমানুল্লাহকে মোবাইল ফোনে প্রাণ নাশের হুমকি দেন এনামুল। পরে আমানুল্লাহ প্রাণ ভয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরী ও দপ্তরে এনামুলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।

এদিকে এখনও তিনি সেখানে যোগদান না করে সরকারী আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে যথেচ্ছাচার করে যাচ্ছেন। কিন্তু দেখার কেউ নেই। এসব বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা, আমদানী রফতানীকারকদের দাবী তারা এনামুল হক মোল্যার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এমতাবস্তায় উর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা ও একই সাথে তার অপসরণের দাবি জানিয়েছেন সবাই। তার এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যেয়ে তার উর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা লাঞ্চিত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, মারপিটের শিকারও হতে হয়েছে অনেকের।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ট্রাফিক পরিদর্শক এনামুল হক মোল্যা বলেন, আমি কি কি চুরি করেছি। আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সবই মিথ্যা। একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। এখানকার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন শেষ নেই। তারা দূর্নীতি করে এখন আমার ঘাড়ে সব দোষ চাপাচ্ছেন।

অভিযুক্ত ট্রাফিক পরিদর্শক এনামুল হক মোল্যার সাথে মুঠোফোনে কথা বলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই একাধিক হলুদ সাংবাদিক মোবাইল ফোনে এনামুল হক মোল্যাকে নিয়ে সাফাই গাইতে শুরু করেন। আবার কেউ কেউ এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্যও অনুরোধ করে।

বেনাপোল স্থল বন্দরের উপ-পরিচালক মামুন কবির তরফদার বলেন, এনামুলের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আছে, যা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এখন সেটা তাদের বিষয়।

বদলির আদেশ দেওয়া প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) প্রদোষ কান্তি দাস বলেন, আমরা তাকে বদলি করেছি। সে যদি এখনও সেই কর্মস্থলে থাকে তাহলে সেটা দেখার দায়িত্ব লোকাল অথরিটির। যদি ঘটনা সত্য হয় তাহলে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হবে বলেও জানান তিনি।

প্রধান কার্যালয়ের অডিট অফিসার আমানুল্লাহ বলেন, আমাকে মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেন এনামুল। বিষয়টি নিয়ে তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়রি করেছি। একইসাথে দপ্তরে অভিযোগও দিয়েছি। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি আজো।

বেনাপোল স্থল বন্দরের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব তারিকুল ইসলাম বলেন, বেনাপোল বন্দরে নতুন যোগদান করেছি। তবে এরমধ্যেই ট্রাফিক পরিদর্শক এনামুল হক মোল্যার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, যা তদন্তাধীন। তবে বদলি ও কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার বিষয়ে আমার জানা নাই। বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।

উল্লেখ, দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে আমদানী ও রফতানি হয় বরাবরই বেশী। অথচ এখানকার বন্দর এবং কাস্টমস বিভাগের অনিয়ম, দূর্নীতি ও অব্যবস্থা কিছুতেই দূর হচ্ছে না। কিছুতেই বাসা ভাঙছে না দূর্নীতির। এনামুলের মত কয়েকজনের অপকর্মের জন্য কলঙ্কিত হচ্ছে অনেকেই। নানা অভিযোগ ও বদলির আদেশ থাকা সত্বেও কিভাবে বছরের পর বছর বেনাপোল স্থল বন্দরে তার শক্ত অবস্থান, এ নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। সকলের কাছে এখন একটাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এনামুলের খুটির জোর কোথায়!