আজও পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায় শার্শার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের মাজারশালা

এ আলী, বেনাপোল : নূর মোহাম্মদ শেখ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে ৭ জন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীরশ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভূষিত করা হয় তিনি তাদের অন্যতম। শার্শার সীমান্তবর্তী কাশিপুর গ্রামের পুকুর পাড়ে তৈরী করা হয়েছে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ স্মৃতিস্তম্ভ মাজারশালা। এখানে নূর মোহাম্মদ শেখসহ ৭ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা চিরতরে ঘুমিয়ে আছে। এ মাজারশালা গুলো আজও পড়ে আছে অযত্ন আর অবহেলায়। সরকারী ভাবে রক্ষণা-বেক্ষণ না করায় সীমান্ত ঘেষা অজপাড়া গায়ের এসব শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মাজারশালা আজ বনে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী নড়াইল জেলার মহিষখোলা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে নূর মোহাম্মদ শেখ জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান ইপিআর-এ যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই নূর মোহাম্মদকে দিনাজপুর থেকে যশোর সেক্টরে বদলি করা হয়। এরপর তিনি ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮নং সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধ চলাকালীন যশোরের শার্শা থানার কাশিপুর সীমান্তের ভারতের বয়রা অঞ্চলে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৯ টা ৩০ মিনিটের সময় ছুটিপুরে নিজস্ব প্রতিরক্ষার সামনে যশোর জেলার গোয়ালহাটি গ্রামে নূর মোহাম্মদকে অধিনায়ক করে পাঁচ জনের একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হঠাৎ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পেট্রোলটি ৩ দিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা গুলিবর্ষণ করা হয়। এক সময়ে সিপাহী নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে নূর মোহাম্মদ নান্নু কে কাঁধে তুলে নেন এবং হাতের এল.এম.জি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করলে শত্রুপক্ষ পশ্চাৎপসরণ করতে বাধ্য হয়। হঠাৎ করেই শত্রুর মর্টারের একটি গোলা এসে লাগে তাঁর ডান কাঁধে। গুলি বিদ্ধ হওয়া মাত্র আহত নান্নু মিয়াকে বাঁচানোর জন্য ব্যাকুল হন তিনি। হাতের এল.এম.জি সিপাহী মোস্তফাকে দিয়ে নান্নু মিয়াকে নিয়ে যেতে বলেন এবং মোস্তফার রাইফেল চেয়ে নিলেন যতক্ষণ না তাঁরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে সক্ষম হন ততক্ষণে ঐ রাইফেল দিয়ে শত্রুসৈন্য ঠেকিয়ে রাখবেন। অন্য সঙ্গীরা তাদের সাথে যাওয়ার জন্যে অনুরোধ করলেও তিনি যাননি। শত্রুদের উপর গুলি ছুড়তে লাগলেন রক্তাক্ত নূর মোহাম্মদ। পাকিস্তানী সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে অর্ধমৃত নূর মোহাম্মদ একটি রাইফেল ও সীমিত গুলি নিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে নিহত হয়। পরে প্রতিরক্ষার সৈনিকরা এসে পাশের একটি ঝাড় থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে। এই বীর সেনানীকে পরবর্তীতে যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলা সদর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার উত্তরে সীমান্ত ঘেষা গ্রামের নাম কাশিপুরের একটি পুকুর পাড়ে সমাহিত করা হয়।

কাশিপুরের ওপারে ভারতের চব্বিশ পরগনার বয়রা। বাংলাদেশ সীমান্তের গোবিনাথপুর আর কাশিপুর মৌজার সীমানার কাশিপুর পুকুর পাড়ে চিরতরে ঘুমিয়ে আছে ৭ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। এখানে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ স্মৃতিস্তম্ভ। তারা দেশের জন্য প্রাণ হারিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করে চিরদিনের মত ঘুমিয়ে আছে এখানে। শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখসহ অপর ৬ জনের মধ্যে রয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আহাদ, শহীদ সুবেদার মনিরুজ্জামান (প্রাক্তন ই,পি,আর), শহীদ সৈয়দ আতর আলী (তদানিন্তর গণ পরিষদ সদস্য), শহীদ বাহাদুর আলী, শহীদ সিপাহী আ: ছাত্তার বীরবিক্রম (প্রাক্তন ই,পি,আর), ও শহীদ সিপাহী এনামুল হক বীর প্রতিক (প্রাক্তন ই,পি,আর)।

১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৯ টা ৩০ মিনিটের সময় ৪ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ ঝিকরগাছার গোয়ালহাটি এলাকায় টহলরত থাকাকালে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক অবিস্বরনীয় সম্মুখ যুদ্ধে নিজ জীবন উৎসর্গ করে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধার জীবন রক্ষার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বাংলাদেশের ইতিহাসে। গোয়ালহাটিতে তার মৃত্যুর পর কাশিপুর সীমান্তের মুক্ত এলাকায় পুকুর পাড়ে দাফন করা হয়।

মাজারশালার এই স্মৃতিস্তম্ভগুলো প্রতিবছর ২/১ বার ধুয়ে মুছে জাতীয় দিবসগুলো পালন করেই যেন দায়িত্ব শেষ। কিন্ত স্মৃতিস্মম্ভসহ এখানকার মাজারশালা গুলো সরকারী ভাবে রক্ষণা-বেক্ষণের কোন উদ্যোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে এসব মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে এখানে একটি মুক্তিযোদ্ধা মিউজিয়াম স্থাপন করার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। মাজারশালার আশ পাশ বনজঙ্গলে ভরে যাওয়ায় সরকারী ভাবে তদারকির জন্য এখানে একজন লোক রাখার দাবী এলাকাবাসীর।

কাশিপুরের শরিফুল ইসলাম বলেন, ২০/২৫ বছর ধরে দেখছি এখানে কাজ করার জন্য কোন লোকজন পাওয়া যায় না। কোন অনুষ্ঠান হলে তখন শুধু এটা পরিস্কার করা হয়। একটি রেষ্ট হাউজ হলে ভাল হয়। পরিবারের লোকজন আসলে বাইরের থেকে চেয়ার এনে বসতে দিতে হয়। এখানে একটা অফিস, কেয়ারটেকারের ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট আবেদন জানাচ্ছি।

শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের নাতিনী কামিনী আফরোজ বলেন, এখানে আমরা এসে একটু বসার মত পরিবেশ পাই না। আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসে আমাদের মুরুব্বীদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। চেয়ারের ব্যবস্থা হয়ত হয়, তবে সেটা ডিসিপ্লিন অনুযায়ী হয় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আবেদন সমগ্র বিষয় বিবেচনা করে সরকারী ভাবে এখানে একটা রেষ্ট হাউজের দাবি জানাই।

শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের পুত্রবধু আনোয়ারা মোস্তফা বলেন, বীরশ্রেষ্ঠের মাজারশালায় নোংড়া থাকায় দারোয়ানের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে এই মাজারশালায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরকারী ভাবে বিশ্রামাগার ও মিউজিয়াম নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।

শার্শা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান বলেন, শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের মাজারশালা সারাবছর ধরে খুব কঠিন অবস্থার মধ্যে থাকে। সেখানে কোন নিরাপত্তা বেষ্টনী নাই। বাইরের থেকে কেউ আসলে বসার রুম বা রেষ্ট রুমের কোন ব্যবস্থা আজও করা হয়নি। ইতিমধ্যে উপজেলা থেকে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে সচিবের নিকট। মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর নিকট দাবি জায়গাটাকে সুন্দর করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য।

যশোর জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, স্থানীয় জনগণের দাবির বিষয়টি আমি শুনেছি। আমরা এই জেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত যে সমস্ত স্থাপনা রয়েছে বা যে সমস্ত বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলো সব আমরা সংরক্ষণের জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা ইতিমধ্যে কিছু কিছু জায়গায় কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদের যে সমাধি রয়েছে, সে সমাধি যথাযোগ্য মর্যাদায় আমরা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিব এবং এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমরা অবহিত করব। মিউজিয়ামের বিষয়টিতো আপনারা জানেন এটা সময় সাপেক্ষ এবং সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমি জানাব।

সীমান্তের অজপাড়া গা এ কাশিপুর গ্রামে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের স্মৃতিস্তম্ভসহ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মাজারশালা গুলি সরকারী ভাবে সংরক্ষণ করে এখানে একটি মুক্তিযোদ্ধা মিউজিয়াম স্থাপন করা হলে আগামী প্রজন্মের সন্তানেরা জানতে পারবে দেশ স্বাধীনের ইতিহাস, এমনটিই আশা করছেন এলাকাবাসী।