এ কি অবস্থা যশোর ছাত্রলীগের নয়া কমিটির !

যশোর : অভিযোগের শেষ নেই যশোর জেলা ছাত্রলীগের নব গঠিত কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধে। কমিটিতে খুনি, অছাত্র, বিবাহিত, মাদক ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ছাত্রদল নেতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্তরা স্থান পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এই কমিটির অনেককে কেউ চেনেনই না। আনকরা মুখকে (অচেনা) স্থান দেওয়া হয়েছে। আর এতে করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ এক নেতার বিরুদ্ধে প্রায় কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য্যরে জেলা যশোর। ৪ এপ্রিল দীর্ঘ দুই বছর পর যশোর জেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত কমিটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২৯ মার্চ সোমবার যশোর আসেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য্য।
সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানি স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছালছাবিল আহমেদ জিসানকে স্থায়ীভাবে বহিস্কার করা হয়। একই সাথে জেলা কমিটি বিলুপ্তি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৪ এপ্রিল যশোর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ২৩ সদস্যর আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। কমিটিতে সভাপতি হয়েছেন সালাউদ্দিন কবীর পিয়াস। পিয়াসের বিরুদ্ধে মামক ব্যবসা ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। বছর দুয়েক আগে যশোর ফায়ার সার্ভিসের অফিসের সামনে থেকে ফেনসিডিলসহ গ্রেফতার করে কোতয়ালি থানার পুলিশ। সে সময়ে কোতয়ালি থানার সিভিল টিমের একটি দল পিয়াসকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর পিয়াসকে কোতয়ালি থানায় নিয়ে আসা হয়। এরপর লাখ টাকার দেনদরবারে মুক্ত হয় পিয়াস। সে সময় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক এক সভাপতি পিয়াসকে থানা থেকে ছাড়ানোর জন্য তদ্বির করে। ওই তদ্বিরে যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতির বর্তমান সেক্রেটারি সেলিম রেজা মিঠু থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। যার প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী ছাত্রলীগের সাবেক অনেক নেতৃবৃন্দ রয়েছেন। শুধু তাই নয়, পিয়াসের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে অনেক আগেই। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসার মনোবাসনার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে বয়স সংশোধনও করেছে পিয়াস।
পিয়াসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে জানতে তার মোবাইল ফোনে ফোন করা হলে ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি ফোন কেটে দেন।
নয়া কমিটির সহ-সভাপতি করা হয়েছে ৯জনকে। এরমধ্যে আট জনের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। সহ-সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত তরুণের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তরুণ অছাত্র, ধারালো অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার এবং নারী কেলেঙ্কারীর অভিযোগ রয়েছে। সহ-সভাপতি আরিফুর রহমান সাগর একটি হত্যা মামলার আসামি। বরিশালে এক শ্রমিক হত্যা মামলায় জেলও খেটেছে সাগর। শুধু তাই নয়, অছাত্র, বিবাহিত ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সহ-সভাপতি শাহাদৎ হোসেন রণি হাওলাদার তাকে যশোরের কোন মানুষ চেননই না। যশোরের ছাত্রলীগের রাজনীতিতে কেউ কোন দিন তাকে দেখেনি। সহ-সভাপতি কায়েস আহম্মদ রিমুর কোন ছাত্রত্ব নেই। অছাত্র ও ব্যবসায়ী। সহ-সভাপতি মো. রাজু রানার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। লেখাপড়া শেষ করে দীর্ঘকাল বিদেশে অবস্থানের পর দেশে এসে বিয়ে করেন রাজু রানা। তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। সহ-সভাপতি রুহুল কুদ্দুস ছাত্রত্বহীন। তিনি কোথায় পড়াশুনো করেন তা কেউ বলতে পারেননি।
সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন তানজীব নওশাদ পল্লব। তিনি ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি। একজন একাধিক পদে থাকবেন আর অন্যরা মুড়ি খাবে সারা বছর এমনটাই হয়েছে নয়া কমিটি নিয়ে। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ রয়েছে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে ছয়জনকে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিফাতুজ্জামান রিফাত একটি হত্যা মামলার আসামি। যশোর সদরের একটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদককে হত্যার অভিযোগ রয়েছে রিফাতের বিরুদ্ধে। যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের বিরুদ্ধে রয়েছে টোকাইগিরি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রত্বহীন আসাদ যশোর পৌরসভার এক জনপ্রতিনিধির বাড়ির কাজের লোক হিসেবে অনেকে চেনেন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান হৃদয় যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতি-২২৭ এর একজন শ্রমিক। তিনি একজন মাদক ব্যবসায়ীও। তার বাবা কসাই বাবুল ওরফে মুরগী বাবুলও একজন মাদক ব্যবসায়ী। যশোরের তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান যশোরের যে কজন মাদক ব্যবসায়ীর বাড়ি ভাংচুর করেছিল তাদের মধ্যে এই হৃদয়দেরও বাড়ি ভাংচুর করা হয়। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিমুল সরদার অছাত্র ও মাদক ব্যবসায়ী। ছাত্রত্ব নেই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হাসান কৌশিকের। তার বাবা খোকন যশোর নগর বিএনপির নেতা এবং মা মহিলা দলের নেত্রী। তার মামা যশোর জেলা বিএনপির প্রয়াত নেতা আব্দার ফারুক।
যশোরের আলোচিত পুলিশ পেটানোর অভিযোগ সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন রিয়াদের বিরুদ্ধে। পুলিশ পেটানোর মামলার আসামি রিয়াদ। যশোরের মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা তরিকুল ইসলাম। তাকে করা হয়েছে সাংগঠনিক সম্পাদক। সে কোথায় পড়াশুনো করেছে ? কখনো কোন দিন ছাত্রলীগ করেছে এমন তথ্য নয়া কমিটির নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই জানেন না। সাংগঠনিক সম্পাদক মারুফ হোসেনের অবস্থাও একই। সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিবুল আলম ঝিনাইদহ জেলার বাসিন্দা। যশোর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নূর জাহান ইসলাম নীরার পিএস হিসেবে কর্মরত। সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম তানভীর আহম্মদ রিয়ালকে কেউ চেনেন না। শেষ সাংগঠনিক সম্পাদক ফাহমিদ হুদা বিজয়। তিনি বিবাহিত ও মাদকসেবী হিসেবে তাকে অনেকেই চেনেন ও জানেন। তার আত্মীয় স্বজন অনেকেই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত।
এই কমিটি সম্পর্কে জানতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আবু নাহিয়ান খান জয় এর ০১৭২৭-৫৪৯৫৯৯ ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য্য ০১৬৭৫৭৮৮৫২২ এবং ০১৯৭৩৭৮৮৫২২ মোবাইল ফোনে দুই দিন ধরে বহুবার ফোন করা হলেও তারা রিসিভ করেননি।
যশোর জেলা ছাত্রলীগের কমিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, এই কমিটির অনেকেরই আমি চিনি না। এদের সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে চাই না।

তথ্য জেলা ছাত্রলীগের নয়া কমিটির কয়েকজনসহ সাবেক দুই কমিটির নেতা শীর্ষ নেতাদের সাথে আলোচনা করে তৈরি করা হয়েছে।