আপনি যখন আপনার ডাক্তার

ওয়ার্ল্ড বিডি নিউজ.কম, ঢাকা : আপনার জীবনের সকল মেডিক্যাল ঘটনায় তৎক্ষণাৎ কাছেই ডাক্তার পাবেন এমনটা নাও হতে পারে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেক মেডিক্যাল সমস্যার ক্ষেত্রে আপনি নিজেই হতে পারেন নিজের ডাক্তার। ‘দ্য সারভাইভাল ডক্টর’স কমপ্লিট’ বইয়ে ডা. জেমস হুবার্ড নিজে নিজে চিকিৎসাযোগ্য এমন অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই প্রতিবেদনে ডা. হুবার্ডের বই থেকে ১০টি সমস্যার সমাধান দেওয়া হলো।

* যদি আঙুলে আংটি আটকে যায়
এটি হচ্ছে অন্যতম সর্বাধিক জনপ্রিয় পরামর্শ, এখানে আপনার আংটি কেটে ফেলার প্রয়োজন হবে না- এক টুকরো লম্বা ডেন্টাল ফ্লস কেটে নিন। আংটি পরিহিত আঙুলের হাতের তালুকে ওপরের দিকে রাখুন। ফ্লসের একটি প্রান্তকে আংটির ভেতর দিয়ে গলিয়ে নিন ও আংটি পরিহিত আঙুলের হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে প্রান্তটি ধরে রাখুন। এখন ফ্লসের অপর প্রান্তটি পেঁচাতে পেঁচাতে আংটি পরিহিত আঙুলের ডগা পর্যন্ত আনুন। এরকম করার কারণ হচ্ছে, আঙুলের ফোলা কমানো যাতে আংটিটি বের হয়ে আসতে পারে। এবার বুড়ো আঙুল দিয়ে ধরে রাখা ফ্লসটি টানতে টানতে সম্পূর্ণ পেঁচ খুলে ফেললেই আংটিটি বের হয়ে যাবে। এই কৌশলটি সবসময় কাজ করে না, কিন্তু যখন করে তখন আংটি ও আঙুল উভয়কে রক্ষা করে। আংটি পরিহিত আঙুলে বা হাতে ইনজুরি হলে এটি ফুলে যাওয়ার আগেই অবিলম্বে আংটিটি খুলে ফেলুন।

* যদি কানের খইলে কান ব্লক হয়
কখনো কখনো কানে অতিরিক্ত খইল জমে কানকে ব্লক করে শ্রবণশক্তিকে অ্যাফেক্ট করতে পারে। এক্ষেত্রে একটি সাধারণ ঘরোয়া চিকিৎসা আপনাকে এ সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। একটি ড্রপার নিন এবং এটিতে কুসুম কুসুম গরম পানিতে পূর্ণ করুন (যদি পানি অত্যধিক ঠান্ডা বা গরম হয়, তাহলে আপনার মাথা ঘোরাতে পারে)। বেসিনের সামনে দাঁড়ান। বেসিনের ওপর মাথা কাত করুন ও সতর্কভাবে কানের ভেতর ড্রপার দিয়ে পানি প্রয়োগ করুন- দুই থেকে চারবার পানি দিন। কোনো ধরনের অস্বস্তি অনুভব করলে থামুন। যদি কিছু বের না হয়, তাহলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করতে পারেন।

* যদি আপনার আঁচিল থাকে
ওয়ার্ট বা আঁচিল অপসারণ করার জন্য আপনার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই- শুধু আপনার কিছু ডাক্ট টেপ লাগবে। আঁচিলটিকে পানিতে প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ভেজান। আঁচিলের অতিরিক্ত চামড়া ঝামা পাথর দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করুন, কিন্তু বেশি জোরে ঘষবেন না অথবা রক্তক্ষরণ হতে পারে এমনভাবে ঘষবেন না। আঁচিলটির সাইজ অনুসারে এক টুকরো ডাক্ট টেপ কাটুন এবং এটিকে আঁচিলের ওপর লাগিয়ে ছয়দিন পর্যন্ত রাখুন। ছয়দিন পর টেপটি খুলে ফেলুন, আঁচিলটিকে আবারো ভেজান এবং পুনরায় টেপ প্রয়োগ করুন। আঁচিল চলে না যাওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া রিপিট করুন। যদি দুই মাসের মধ্যে আঁচিল দূর না হয়, তাহলে এ পদ্ধতি সম্ভবত আপনার জন্য কার্যকর হবে না- এ অবস্থায় এ প্রক্রিয়া বন্ধ করুন এবং অন্যকিছু চেষ্টা করুন।

* চোখের ভেতর কিছু পড়েছে, কিন্তু তা খুঁজে পাচ্ছেন না
যদি আপনার মনে হয় যে ক্ষুদ্র কোনোকিছু আপনার চোখে পড়েছে, কিন্তু আপনি এটি দেখতে পাচ্ছেন না, তাহলে এটি আপনার ওপরের চোখের পাতার নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে। এটি দেখা ও অপসারণ করার জন্য দুইটি পরিষ্কার কটন সোয়াব নিন। একটি কটন সোয়াবের প্রান্তকে ওপরের চোখের পাতার বিপরীতে ধরুন। নিচের দিকে তাকান এবং ওপরের চোখের পাতাকে কটন সোয়াবের ওপর ফ্লিপ করুন। যদি কেনোকিছু দেখেন, তাহলে অন্য কটন সোয়াব দিয়ে তা অপসারণ করুন। যদি কোনোকিছু না দেখেন, তাহলে আপনার সমস্যাটি স্ক্র্যাচ হতে পারে- কোনো কণা বা বাইরের অন্য কিছু নয় নয়।

* যদি টিক পোকা কামড়ে ধরে
টিক পোকা অপসারণের সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে চিমটা ব্যবহার করা। চিমটা দিয়ে টিক পোকাটিকে আঁকড়ে ধরুন, এরপর বলপ্রয়োগে টিক পোকাটিকে তুলে ফেলুন। এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে পোকাটির পুরো শরীর তুলে ফেলা যাবে এবং আপনার ত্বকে পোকাটির মাথা লেগে থাকার আশঙ্কা থাকবে না। শরীর থেকে টিক পোকা দূর করার জন্য হট ম্যাচ কিংবা পেট্রোলিয়াম জেলির ব্যবহার ভালো আইডিয়া নয়।

* ত্বকের ভেতর নখ ঢুকে গেলে
ত্বকের ভেতর পায়ের নখ ঢুকে যাওয়াকে ইনগ্রোন টোনেইল বা নখকুনি বলে। পায়ের আঙুলের আক্রান্ত অংশকে গরম পানিতে ১০ মিনিট ভিজিয়ে স্থানটি শুকিয়ে নিন। এরপর আক্রান্ত পায়ের আঙুলের কোণায় এক খন্ড কটন (তুলা) বল প্রবেশ করান। আশা করা যায় যে, এটি ত্বকের ভেতর ঢুকে যাওয়া নখের প্রান্তকে বের করে আনতে সাহায্য করবে। প্রতি চার থেকে ছয় ঘণ্টা পরপর আক্রান্ত স্থান ভেজানোর কাজটি পুনরায় করুন, কটন বের হয়ে আসলে তা পুনরায় ঢুকিয়ে দিন- ত্বকের ভেতর থেকে নখের অংশ বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত কটনটি সেখানে রাখুন। যদি ইনগ্রোন নেইল ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভালো না হয় অথবা এটির অবস্থা আরো খারাপ হয়, তাহলে সম্ভবত এই পদ্ধতি আপনার জন্য কার্যকর হবে না এবং আপনার ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হবে, কারণ আক্রান্ত স্থানে ইনফেকশন হতে পারে। এই সমস্যা প্রতিরোধ করতে নিয়মিত নখ কাটুন।

* যদি মচকে যায় অথবা চোট লাগে
আপনার শরীরের কোথাও মচকে গেলে অথবা চোট লাগলে সেই স্থান ফুলে যেতে পারে। এক্ষেত্রে সর্বজনবিদিত নীতি হচ্ছে- যদি আক্রান্ত স্থানে ব্যথা অনুভূত হয়, তাহলে এটিকে ব্যবহার করবেন না। মচকানি বা চোট লাগার ক্ষেত্রে একটি ভালো পদ্ধতি হচ্ছে, রাইচেস (RICES)। R=Rest, আক্রান্ত স্থানটিকে বিশ্রামে রাখুন। I=Ice, আক্রান্ত স্থানে ১০ মিনিট বরফের সেঁক দিন, তারপর ১০ মিনিটের বিরতি, ত্বক ও বরফপ্যাকের মাঝে কাপড় ব্যবহার করুন যেন আপনার ত্বক হিমায়িত হয়ে না যায়। C=Compress, একটি ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ দিয়ে আক্রান্ত স্থানটিকে মোড়ান- এত টাইট করে মোড়াবেন না যাতে সংবহন ব্যাহত হয়। E=Elevate, ইনজুরিটিকে হার্ট লেভেলের ওপরে তুলুন। S=Splint, ইনজুরিটিকে স্প্লিন্ট করুন যাতে এটি নড়তে না পারে ও আরো ইনজুরি হওয়া থেকে রক্ষা পায়।

* কারো শ্বাসরোধ হলে
যদি বুঝতে পারেন যে কারো শ্বাসরোধ বা চোকিং হচ্ছে তাহলে প্রথমে তাকে জিজ্ঞেস করুন যে তার চোকিং হচ্ছে কিনা এবং সাহায্যের প্রয়োজন আছে কিনা। লোকটি হ্যাঁ বললে ও সাহায্যের জন্য অনুমতি দিলে তাকে দাঁড়াতে বলুন যাতে আপনি অধিকতর ভালো ভাবে পদ্ধতিটি প্রয়োগ করতে পারেন। লোকটির পেছনে যান। আপনার ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করুন এবং বুড়ো আঙুলের পাশটিকে লোকটির মধ্যপেটে (বুকের ঠিক নিচে) স্থাপন করুন। এবার অন্য হাতটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের ওপর রাখুন ও হাতটিকে তীব্রভাবে ঝাঁকান। গলায় আটকে থাকা খাবার বা অবজেক্ট বের না হয়ে আসা পর্যন্ত এটি পুনরায় করুন। যদি লোকটি অচেতন হয়ে যায়, তাহলে চেস্ট কম্প্রেশন (বুকে চাপ প্রয়োগ) শুরু করুন- যেমনটা করতে হয় সিপিআরের ক্ষেত্রে। চোকিং সাধারণত নীরব ঘটনা। যদি লোকটি কাশতে পারে তাহলে তাকে নিজে নিজে আটকে থাকা অবজেক্ট বের করার জন্য চেষ্টা করতে দিন। কারো শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে সিপিআরের পদক্ষেপ অনুসরণ করুন।

* আঙুল থেঁতলে গেলে
যদি আপনার কোনো আঙুল থেঁতলে যায়, তাহলে নখের নিচে কালশিটে দাগ হবে- এই কালশিটের রক্ত শরীরের অন্যান্য জায়গার মতো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। নখের নিচে রক্ত আটকা পড়ে। চাপ সৃষ্টি হয় এবং কখনো কখনো সেখানে তীব্র ব্যথা হয়। যদি আপনি দেখেন যে থেঁতলে যাওয়ার পর আঙুলের নখের নিচে কালশিটে দাগ হয়েছে, তাহলে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেন যে কি কারণে ব্যথা হচ্ছে- এই ব্যথা আরো বেড়ে যেতে পারে। চাপ থেকে মুক্তি পেতে আপনি লাইটার, পেপার ক্লিপ ও প্লাইয়ারের সাহায্যে নখটিতে একটি ছিদ্র করতে পারেন। পেপার ক্লিপটিকে আনবেন্ড করুন যেন এটি সোজালাইনে থাকে। প্লাইয়ার দিয়ে ধরে পেপার ক্লিপটিকে লাইটারের অগ্নিশিখায় রাখুন, ততক্ষণ রাখুন যতক্ষণ পর্যন্ত না এটি লাল হয়। উত্তপ্ত পেপার ক্লিপটির প্রান্ত দ্রুত কালশিটেটির মাঝখান বরাবর এক সেকেন্ডের কম সময়ের জন্য চেপে ধরুন। আপনি দেখতে পাবেন যে নখটিতে একটি ছিদ্র হয়েছে, ব্যথা দ্রুত উপশম হবে ও রক্ত বের হয়ে যাবে। নখে ছিদ্র না হলে এই প্রক্রিয়া পুনরায় করুন।

* যদি রক্তক্ষরণ হয়
৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতস্থানে সরাসরি চাপ প্রয়োগে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। একটি পরিষ্কার কাপড় নিন, এটিকে দলা পাকান এবং তা ক্ষতস্থানের ওপর সরাসরি চেপে ধরুন- এভাবে কয়েক মিনিট ধরে রাখুন। যদি চাপ প্রয়োগ সত্ত্বেও প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে, তাহলে আপনার টার্নিকেট (রক্তক্ষরণ বন্ধ করার ব্যান্ডেজ বা যন্ত্র) প্রয়োজন হবে- এ অবস্থায় কাউকে জরুরি নম্বরে কল করতে বলুন অথবা আপনাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে বলুন। প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে আপনি দুর্বল হয়ে যাবেন এবং চাপ প্রয়োগের সময় আপনার বসা বা শোয়ার প্রয়োজন হবে।